WBRi | Washington Bangla Radio on internet

নিঃশব্দ পৃথিবী----চিরন্তন ভট্টাচার্য --A short story.


আজ সোমবার। আমি কিছুক্ষণ আগে মারা গেছি। আজকে আর অফিস যেতে হবে না। রান্নাঘরে বাটির মধ্যে কিছুটা চাল ভেজানো আছে। অফিসে যাওয়ার আগে অল্প একটু ভাত ফুটিয়ে খেয়ে যাব ভেবেছিলাম। স্টোভটা জ্বালানো হয়নি। মেঝেতে দু’টো আলু আর একটা ছুরি পড়ে আছে। কেউ অসাবধানে ঢুকতে গেলে ছুরিতে আহত হতে পারে কেন না আমি এখন সাবধান করতে পারবো না। মৃত্যু একটা অত্যন্ত জটিল আর একঘেয়ে একটা বিষয়। তাই কিভাবে মারা গেলাম? কখন মারা গেলাম? এইসব বিষয়গুলোর দিকে আর ফিরে তাকাচ্ছি না। মারা গেছি। ব্যাস মারা গেছি। এবং আজ সোমবার। আজ সমস্ত অফিস খোলা। কিন্তু আমাকে আজকে অফিসে যেতে হবে না!

মৃত্যুর পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলোও ভীষণ দীর্ঘায়ত এবং খুব বিরক্তিকর একটা প্রক্রিয়া। আপাতত আমার মৃতদেহটা খাটের পাশেই মেঝেতে পড়ে আছে। দরজা খোলা। যে কেউ ঢুকলেই দেখতে পাবে। অবশ্য এক্ষুণি দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আমার ঘরে সহজে কেউ আসে না। আমি এক্কেবারেই সদালাপী ব্যাক্তি ছিলাম না। হয়ত কিছুক্ষণ পরে যখন মিসেস ব্লু আসবেন তখন দেখতে পাবেন। এই ছোট পাহাড়ি শহরটায় কারোর ঘরেই কোনো তালা নেই। আমি অফিসে বেরিয়ে যাবার সময়ে দরজাটা ভেজিয়ে রেখে বেরিয়ে যাই যাতে ধুলোবালি না ঢোকে! আমি এটাও জানি আমি অফিসে বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরেই মিসেস ব্লু আমার ঘরে ঢুকে সমস্ত অগোছালো ঘরটাকে একটা পরিচ্ছন্ন অবস্থায় রেখে যান। উনি আমাকে কোনোদিন কিছু বলেন নি। বা আমিও ওনাকে কোনোদিন আমার ঘর থেকে ঢুকতে বা বেরতে দেখিনি। কেউ জিজ্ঞাসা করতেই পারেন তাহলে আমি এতটা নিশ্চিত হতে পারলাম কি করে! প্রত্যেকেই জানেন প্রত্যেক মানুষের ভিতরেই বিশেষ কিছু আন্দাজ থাকে যা নির্ভুল কিন্তু যার কোনো প্রমাণ তার নিজের কাছেও থাকে না। আমার মৃত্যু নিয়ে কারোকে কোনো খবর দেওয়ার নেই। দেবকীর সাথে আমার এখনও আইনগত ভাবে বিচ্ছেদ না হলেও ওর কোনো ঠিকানা বা ফোন নাম্বার আমার জানা নেই। সুতরাং ওকে খবর দেওয়ার কোনো উপায় এক্ষুণি নেই। কিছুদিন আগে অবশ্য সমর চৌধুরী বলে একজন আমাকে ফোন করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন যে দেবকীর সাথে আমার আইনগত বিচ্ছেদ সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র আমাকে পাঠানো হচ্ছে আমি যেন সেইগুলো যত দ্রুত সম্ভব সই করে ফেরৎ পাঠিয়ে দিই! ভদ্রলোক অবশ্য এও বলেছিলেন যে আমার যদি কোনো আর্থিক দাবিদাওয়া থাকে তাহলে দেবকী সেটা যথাসম্ভব পুরন করার চেষ্টা করবে। আমি এখনও ঠিক জানি না দেবকী সত্যিই আমার ওপরে দয়া দেখাতে ওরকম বলা করিয়েছিল না কি আমার আর্থিক অবস্থা নিয়ে ওরা ব্যাঙ্গ করার জন্য এটা করেছিল! জানি না! যাইহোক যেহেতু মৃত্যু সংবাদ তাই ঠিকই ওর কাছে পৌঁছে যাবে সংবাদটা। অবশ্য মৃতদেহের সৎকারের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কেন না সেই প্রক্রিয়াটা তার আগেই করতে হবে। কেন না অতক্ষণ সময় মৃতদেহ দেয় না! তবে সংবাদটা পেলে দেবকী মনে হয় শান্তি পাবে কেন না কাগজপত্রগুলো আর সই করানোর জন্য পাঠাতে হবে না!

আসলে মৃত্যু একটা অবধারিত প্রক্রিয়া কিন্তু খুব চড়া একটা আবেগ কাজ করে বলে অনেকসময় বিষয়টা খুব জোলো হয়ে যায়। আমি দরজা পেরিয়ে খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। দরজাটা খোলাই ছিল। অবশ্য মৃত মানুষদের জন্য দরজা বা দেওয়াল কোনো বাধা নয় মনে হয়। একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করছিল। কালকের আনা প্যাকেটটা তে এখনো তিনটে সিগারেট রয়ে গেছে। কিন্তু মৃত ব্যাক্তি সিগারেট টানছে এমন আজগুবি ব্যাপার শুধু হলিউডের উদ্ভট ভূতের সিনেমাতেই সম্ভব। হঠাৎই আমার রাস্তার দিকে চোখ পড়ে গেল। খুব ধীরে সুস্থে রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছেন ম্যাডাম টোপিওকা! মৃত মানুষদের হার্ট থাকে না তাই না হলে এত বছর পরেও আমার হার্টফেল করে যেত। কিন্তু ম্যাডাম টোপিওকা তো ডালটনগঞ্জের! ইউনাইটেড মিশনারি স্কুল! উনি এখানে কবে এলেন! এত ছোট জায়গায় কেউ এলেই জানতে পারা যায়! সবাই সবাইকে চেনে এখানে। তাছাড়া আরও একটা জিনিষ আশ্চর্য লাগলো ওনাকে আমি শেষবার দেখেছি প্রায় পঁচিশ বছর

আগে। এখনও একফোঁটাও বদলান নি! তারপরেই মাথায় এলো চিন্তাটা তাহলে ম্যাডাম টোপিওকাও কি আমার মতই মৃত ব্যাক্তি! তখনই দেখলাম উনি আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে সুন্দর করে একটা হাসলেন! তারপরে আবার আগের মতই হাঁটতে লাগলেন। হঠাৎই মাথাটা ঘুরিয়ে দেখলাম আমার পাশে দেখলাম আমার কলেজের বন্ধু সুরঞ্জন। সেই বড় বড় চোখ। সেই মুখ টিপে হাসি। আমি চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম। দেখলাম সুরঞ্জন আমাকে ইশারায় পিছনের দিকে তাকাতে বলছে। আরে মৌমিতা! সেই নীলদিঘি, সেই ডুবজলে পানকৌড়ি, সেই হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে রাখা কেঁপে কেঁপে ওঠা হাত! তারপরে তো কে কোথায় ছিটকে গেলাম। ‘আয় আর একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়।’ এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে মৌমিতা এখনও সেই ছিপছিপে প্রজাপতির মতই রয়ে গেল!

সামনের সিগারেটের দোকানের ছেলেটার কাছে একশো বিয়াল্লিশ টাকা ধার রয়ে গেছে। মাসের শেষ দিকটায় থাকে ওইরকম। আবার বেতন পেলে শোধ করে দি। এবারে আর বেতন পাওয়া হবে না। দেবকী খবরটা পেলেও এখানে কোনো ভাবেই আসবে না আর ওই সামান্য বেতনের টাকা ও ছুঁয়েও দেখবে না! কিন্তু আমার ওয়ালেটটাতে এখনো খুচরো আর নোট মিলিয়ে দু’শ বিরানব্বই টাকা আছে। ছেলেটার ধারটা শোধ হয়ে জেত কিন্তু সে আর হবার নয়। প্রবাহের মত এসে যাচ্ছে ওরা! নীলেশ, সুগত, দানীশ, জোশি, নয়না, ইসমাইল, সাবিনা, আরে আরে নীলপরি! ‘চোখ লয় দুটি ভ্রমর কাজল কালো’! আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি ওরা আমাকে খুঁজে পেল কিভাবে! তারপরেই বুঝতে পারলাম রহস্যটা। আসলে সময় আর আমাদের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে না। যেমন আজ সোমবার। আজ সমস্ত অফিস খোলা। কিন্তু আজ আর আমাকে অফিস যেতে হবে না! হয়তো আর একটু পরেই মিসেস ব্লু এসে যাবেন। তারপরেই একটা হইচই শুরু হয়ে যাবে। মৃতদেহ আবিষ্কারের পরবর্তী প্রক্রিয়াটা খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়!






Recommended for you:

View Site in Mobile | Classic
Share by: