WBRi | Washington Bangla Radio on internet

দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম---চিরন্তন ভট্টাচার্য ( A Short Story By Chirantan Bhattacharyya)


দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম

বরের সামনে চায়ের কাপটা’কে ঠক করে নামিয়ে বাজারে যাওয়ার জন্য ঝাড় দিয়ে এসে ভাঁজ করা খবরের কাগজটাকে বারান্দার গ্রিলের ফাঁক থেকে নিয়ে বগলে চেপে রেখে প্রেমিককে হোয়াটসঅ্যাপ করছিল অলকা, “দাঁত মেজেছ সোনা?” মেসেজটাকে সেন্ড করে দিয়ে আবার লিখল “বউকে বল একটু আদা দিয়ে চা করে দিতে। কাল রাতে তোমার মেসেজ পড়তে পড়তেই মনে হচ্ছিল যে তোমার ঠাণ্ডা লেগেছে।” পরের মেসেজে কয়েকটা লাল ঠোঁটের ইমোটিকন। তার পরের মেসেজে আবার লিখল, “অবশ্য তুমি আবার বউকে যা ভয় পাও! দ্যাখো সাহস করে বলতে পার কি না?” “না হলে আমার কাছে চলে এস আমি তোমাকে আদা দিয়ে চা করে খাওয়াবো সোনা!” মোবাইলটাকে এক হাতে রেখে খবরের কাগজটাকে এরপরে অন্য হাতে নিয়ে বরকে আরেকবার বাজারে যাওয়ার জন্য গুঁতো মারতে হবে ভাবতে ভাবতে কাগজের ওপর আলতো করে চোখটা রাখল। লোকটা তিলেবজ্জাত! কাল রাত্তির থেকে নাক টানছে, সর্দির বাহানা করে বাজার না যাওয়ার তাল! এসব লোককে কি করে ঢিট করতে হয় অলকার ভাল করে জানা আছে। কিন্তু পা বাড়াবার আগেই খবরের কাগজের প্রথম পাতায় চোখ রাখতেই মাথাটা ঘুরে গেল! সামনে একটা চেয়ার পেয়ে ধপ করে বসে পড়তেই পড়তেই বুঝতে পারছিল যে চোখে অন্ধকার দেখছে আর মাথাটা ঝিমঝিম করছে।

মিস মালবিকা মিত্র। কর্পোরেট কোম্পানিতে বেশ উচ্চপদের চাকুরে। প্রথম যৌবনে বিয়ে করা হয়নি। এখন আর ওসব আপদের কথা মাথাতেও আসে না। রান্নার লোক টুম্পা এসেই এক কাপ গরম কফি করে দিয়েছে। মেয়েটা কফি অসাধারণ বানায়। টেবিলের ওপরে বাংলা আর ইংরেজি দু’টো দৈনিক ভাঁজ করে রাখা। এখন আবার স্টাইল হয়েছে প্রথম পাতায় কোনো খবর থাকে না শুধুই বিজ্ঞাপন। আনমনে বাংলা কাগজের খবরের প্রথম পাতাটাকে বার করে কিন্তু ওদিকে না তাকিয়ে মোবাইল থেকে ফেসবুকটা খুলে একবার দেখে নিচ্ছিল। সারাদিনে আর দেখার চান্স পাওয়া শক্ত। একদম ওপরে দু’টো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। ওসব পরে দেখে ডিলিট রিকোয়েস্ট করে দিতে হবে। আলতু ফালতু লোকের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই। তারপরে তিনটে ইনবক্স মেসেজ আর সতেরোটা নোটিফিকেশন। ওগুলো দেখে নিলেই হবে। কালকেই প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করেছিল। কিন্তু নিউজ ফিড-এ চোখ পড়তেই মাথাটা গরম হয়ে গেল – স্বরচিত কবিতা! ফেসবুকে আজকাল কবির সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে চোখ রাখতেই ভয় হয়। কিছুদিন আগে অবধি একটা লোক তো আবার কবিতা লিখে ওকে ট্যাগ করা শুরু করেছিল। তারপরে একদিন বেদম ঝাড় খেয়ে এখন থেমেছে! বিরক্ত মুখ নিয়ে মোবাইল থেকে মুখ তুলে একবার খবরের কাগজটার ওপর চোখ রাখল। প্রথম পাতায় খুব ছোট্ট করে একটা জায়গায় গভীর রাতের খবর বলে যা লেখা আছে তা পড়তে গিয়েই মাথাটা ঘুরে গেল!

নক্ষত্র তালুকদার। বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। আবার সন্ধেবেলা সাজুগুজু করে টিভির নিউজ চ্যানেলে বসেন। সেই কারণে বেশ পরিচিত মুখ। শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, রাষ্ট্রনীতি থেকে ফ্যাশন থেকে সিনেমা থেকে হা ডু ডু খেলা পর্যন্ত তাঁর অগাধ জ্ঞানে সবাই আশ্চর্য হয়ে যায়। সক্কালবেলা ঘুম থেকে উঠে ধোঁয়া ওঠা সোনালি চা আর দু’টো ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট টেবিলে রাখা অবস্থায় খবরের কাগজটাকে নেওয়ার জন্য বউয়ের সাথে রুমাল চুরি খেলছিলেন! বারোটা বছর ধরে দাম্পত্য সম্পর্ককে অটুট রাখা কি চাট্টিখানি কথা! মাঝে মাঝে একবার করে সোফায় বসে এক কামড় বিস্কুট আর এক চুমুক চা খেয়ে আবার খেলা! খেলাটা অবশ্য বেশিক্ষণ চলল না। দু’জনেরই বেরোবার তাড়া আছে। খুশিতেও আবার ক্লান্তিতেও সোফায় বসে আয়েশ করে চা-এ কয়েকটা চুমুক দেওয়ার পরে খবরের কাগজের প্রথম পাতাটা খুলেই আকস্মিকতায় বিহ্বল হয়ে গেলেন! কপালে অনেকগুলো ভাঁজ। অনেক চেষ্টা করে যেন কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না কিছুতেই।

আসলে যে খবরটা নিয়ে এত মানুষের এত উৎকণ্ঠা তা অনেকটা ওই ফেরিওয়ালার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এক হাজার কোটি টাকার মতই অসম্ভব আর চমকপ্রদ। একটি খবরের কাগজ তাদের বিশেষ প্রতিনিধি মারফত অনেক রাত্রে একটি খবর পায় যে সুইডিশ অ্যাকাডেমি একটি প্রেস রিলিজে জানিয়েছে এই বছরে সাহিত্যের জন্য নোবেল পাচ্ছেন বাংলা ভাষার কবি শ্যামাপদ কর্মকার! খবরটা এতই অসম্ভব ছিল যে বার্তা সম্পাদক শুনেই ভেবেছিল যে নিশ্চয় কোনো জোকস শেয়ার করছে। কিন্তু পরে বুঝতে পারলেন যে তা নয়। ততক্ষণে কাগজ প্রিন্ট হতে চলে গেছে। শেষ পর্যন্ত কোনোরকমে দু’লাইন সর্বশেষ সংস্করণে ঢোকানো গিয়েছিল। যদিও প্রথমদিকে লোকে বুঝতেই পারছিল না শ্যামাপদ কর্মকারটা কে! তাও ফেরিওয়ালার অ্যাকাউন্টে হাজার কোটি টাকা ঢুকে যাওয়ার মত ভ্রমের খবর এটা নয়। রীতিমত সুইডিশ অ্যাকাডেমির প্যাডে সই করে শ্যামাপদ কে পুরস্কার নিতে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নিউজ চ্যানেলে বসে শ্যামাপদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছিলেন নক্ষত্র তালুকদার। শ্যামাপদ-র কোনো কাব্যগ্রন্থই বেরোয়নি এখনো। শ্যামাপদ আসলে ফেসবুক কবি। তার একটি নিজস্ব ফেসবুক পেজ-ই শুধু সম্বল। পেজের নাম ‘শ্যামা পদ’ পরে ডিটেইলসে লেখা ‘শ্যামাপদর পদাবলি’! নক্ষত্র তালুকদারের পাশের চেয়ারে বসে শ্যামাপদ প্রশস্তি করছিলেন সোমনাথ গুহ, “রবীন্দ্রনাথের পরে শ্যামাপদই দ্বিতীয়জন যিনি বাংলা সাহিত্যে নোবেল পেলেন।” সঙ্গেই সঙ্গেই নিজের লাইনটা ফিরে পেয়ে গেলেন নক্ষত্র তালুকদার, “নো, শ্যামাপদই প্রথম বাংলা সাহিত্যে নোবেল পেলেন। টেগোর ওয়াজ্‌ দ্য সেকেন্ড নোবেল লরিয়ট ফর ইংলিশ ল্যাঙ্গোয়েজ ওনলি আফটার দ্যা রুডিয়ার্ড কিপলিং ইন নাইনটিন হানড্রেড এন্ড সেভেন।” একটু থেমে বললেন, “পরে অবশ্য উইকিপিডিয়া ইংরেজির সাথে বাংলাও যোগ করেছে কিন্তু এটা পরিষ্কার ভাবেই উল্লেখ আছে যে তিনি নোবেল পেয়েছিলেন ফর হিজ্‌ ইউনিক ইংলিশ রাইটিংস। শ্যামাপদ আরেকটা ব্যাপারেও প্রথম। শুধুমাত্র ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে সাহিত্য করে এই প্রথম কেউ নোবেল পুরস্কার পেলেন!”

ফেসবুক কবি শ্যামাপদ কি করে নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেলেন তা আমার জানা নেই। কারা তার নাম প্রস্তাব দিয়েছিল তাও জানি না। তার কবিতা ফ্রেঞ্চ বা সুইস ভাষায় কে অনুবাদ করেছিল তাও জানা নেই! কিন্তু ‘শ্যমা পদ’ এখন বই হয়ে বেরিয়ে গেছে। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষায় অনুবাদের কাজ চলছে। বিশেষ করে ওর একটা কবিতা ‘অন্ধকারের নাম পরমাণু বিস্ফোরণ’ মারাত্মক জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে। বলা হচ্ছে অ্যালেন গিনসবার্গের ‘September On Jessore Road’ –এর পর গোটা পৃথিবীতে এত সাড়া ফেলে দেওয়া কবিতা আর লেখা হয়নি। ‘আমার কোঁচকানো শার্টের ভাঁজে ভাঁজে / বোমারু বিমান নেমে আসে / মধ্যরাতে প্যারাট্রুপার নয় / প্রিয়তমা / তোমার সিক্ত চুম্বনের ভিতরে চাঁদ / রুপোলী বৃষ্টি ঝরায়...’ বলা হচ্ছে যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রেম নিয়ে এত বলিষ্ঠ লেখা আর হয়নি। কবিতাটা যে মালবিকা মিত্র-কে মনে করে লেখা সেটা এখন শ্যামাপদ বিলকুল চেপে গেছে! মালবিকা সামান্য ট্যাগ করা নিয়ে ঝাড় দিয়েছিল! শ্যামাপদর বউ অলকা এখন খুব যত্ন করে মিনিস্কার্ট আর টপ পরা প্র্যাকটিস করছে। কেউ কেউ অবশ্য বুঝিয়েছে নোবেলের মঞ্চে বরের পাশে শাড়ি পরেই যেতে কেন না সেটাই হবে বাঙালি ট্র্যাডিশন। নোবেলের মঞ্চে না হয় শাড়ি পরেই যাবে কিন্তু শাড়ি পরে বেড়াতেও কি বেরোবে না কি? অত দূরে যাচ্ছেই যখন ইউরোপটা ঘুরেই তো আসবে। তাই এখন অলকা হাল ফ্যাশনের বিভিন্ন মিনিস্কার্ট আর টপ পরে সেলফি তুলে তুলে প্রেমিককে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠায় আর জিজ্ঞাসা “কি গো কেমন লাগছে বললে না তো! না কি বউ-এর ভয়ে এটাও বলা যাবে না!”

চিরন্তন ভট্টাচার্য





Recommended for you:

View Site in Mobile | Classic
Share by: